Members Registration

দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশ চলতি বছর তাদের পাঁচ দশকের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে একটি যুগান্তকারী বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে, উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রী সফরে এবং কূটনৈতিক গতিকে শিল্প বিনিয়োগে রূপান্তরের লক্ষ্যে বেসরকারি খাতের নিরলস প্রচেষ্টায়।

এ পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ), যা গত ৪ আগস্ট ঢাকায় এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুষ্ঠানে স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কু। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য কোরীয় বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পাবে, আর কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্য বাংলাদেশে একই সুবিধা পাবে। কোরিয়ায় রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকার ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে; বিপরীতে কোরিয়ার রফতানি পণ্য—যেমন ইনস্ট্যান্ট নুডলস, সিজনড লাভার, কনফেকশনারি ও ডিজেল (বাংলাদেশে কোরিয়ার একক বৃহত্তম রফতানি পণ্য)—শুল্কমুক্তভাবে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করবে। দুই দেশের কর্মকর্তারাই বলেছেন, এ চুক্তি নিছক শুল্ক হ্রাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিনিয়োগ সুরক্ষা, সেবা খাতে বাণিজ্য, শুল্ক সহযোগিতা, ডিজিটাল বাণিজ্য ও মেধাসম্পদ অধিকারকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে।

এ পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ), যা গত ৪ আগস্ট ঢাকায় এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুষ্ঠানে স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কু। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য কোরীয় বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পাবে, আর কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্য বাংলাদেশে একই সুবিধা পাবে। কোরিয়ায় রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকার ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে; বিপরীতে কোরিয়ার রফতানি পণ্য—যেমন ইনস্ট্যান্ট নুডলস, সিজনড লাভার, কনফেকশনারি ও ডিজেল (বাংলাদেশে কোরিয়ার একক বৃহত্তম রফতানি পণ্য)—শুল্কমুক্তভাবে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করবে। দুই দেশের কর্মকর্তারাই বলেছেন, এ চুক্তি নিছক শুল্ক হ্রাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিনিয়োগ সুরক্ষা, সেবা খাতে বাণিজ্য, শুল্ক সহযোগিতা, ডিজিটাল বাণিজ্য ও মেধাসম্পদ অধিকারকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে।

প্রায় এক বছরের মধ্যে পাঁচ দফা আনুষ্ঠানিক আলোচনার পর চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়, যা এত ব্যাপক পরিসরের একটি চুক্তির জন্য বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। আগামী নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময়ের মাত্র কয়েক মাস আগে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলো—এমন এক রূপান্তরকালে, যখন এলডিসি মর্যাদার সুবিধা ফুরিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক বাণিজ্য অংশীদারত্ব গড়ে তোলা ঢাকার জন্য কৌশলগত অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে।

মন্ত্রী ইয়োর ঢাকা সফর স্পষ্ট করে তোলে, দুই সরকার এ সম্পর্ককে কতটা রাজনৈতিক গুরুত্ব দিচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষরের একদিন আগে তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং তাকে চুক্তির অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করেন। এ সময় তিনি জানান, ক্রমবর্ধমান সংখ্যক কোরীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে আগ্রহী। জবাবে প্রধানমন্ত্রী কোরীয় উদ্যোক্তাদের জাহাজ নির্মাণ, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস, টেলিযোগাযোগ, অটোমোবাইল ও খেলনা শিল্পে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। উভয় পক্ষই এ সাক্ষাৎকে চুক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচনার ইঙ্গিত হিসেবে অভিহিত করে।

 

এ গতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে দুই দেশের বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয় ও সংস্থা, দ্বিপক্ষীয় দূতাবাসসমূহ এবং কোরিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। বিশেষত কেবিসিসিআই দুই দেশের সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন (স্টেকহোল্ডার) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা এগিয়ে নিতে উভয় সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

গত জুনে কেবিসিসিআইয়ের নেতৃত্বে ৪১ সদস্যের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল কোরিয়া ইমপোর্ট এক্সপো ২০২৬-এ অংশ নিতে সিউল যায়, যেখানে ৩২টি বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য প্রদর্শন করে ‘ইনভেস্ট ইন বাংলাদেশ: অ্যাডভান্সিং ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট থ্রু স্ট্রং বাইল্যাটারেল রিলেশনস’ প্রতিপাদ্যে। প্রতিনিধি দলটি তিনদিনে ১৫টিরও বেশি বিটুবি বৈঠক করে এবং কোরিয়া ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, যা ২০২৪ সালে দুই সংস্থার মধ্যে স্বাক্ষরিত সহযোগিতা সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতা। সিউলে বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত এক সংবর্ধনায় সাবেক কোরীয় রাষ্ট্রদূতদের উপস্থিতি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতার মধ্যকার সমন্বয়কে আরো স্পষ্ট করে তোলে।

বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত কিম জি-জুন বলেছেন, সিইপিএর মাধ্যমে সৃষ্ট গতি অবশ্যই বাস্তব যৌথ উদ্যোগ ও নতুন বিদেশী বিনিয়োগে রূপান্তরিত হতে হবে, নিছক একটি কূটনৈতিক মাইলফলক হয়ে থাকলে চলবে না।”

কেবিসিসিআইয়ের এ তৎপরতা দেশের অভ্যন্তরেও অব্যাহত রয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ‘নেভিগেটিং দ্য ন্যাশনাল বাজেট ২০২৬-২৭: অপরচুনিটিজ ফর বিজনেস অ্যান্ড ইনভেস্টরস’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে কেবিসিসিআই, যেখানে রাষ্ট্রদূত কিম সিইপিএর গতিকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তরের আহ্বান জানান। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান সুযোগ, আরো বিনিয়োগবান্ধব শুল্ক কাঠামো, সমন্বিত শিল্প ক্লাস্টার, যৌথ উদ্যোগের জন্য পূর্বাভাসযোগ্য প্রণোদনা এবং বিদেশী বিশেষজ্ঞদের জন্য সহজতর ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট প্রক্রিয়ার দাবি জানান—এমন সব বিষয়, যা কোরীয় বিনিয়োগকারীরা বছরের পর বছর ধরে তুলে ধরছেন। সেমিনারে অর্থ আইন ২০২৬-এর কর ও শুল্কসংক্রান্ত পরিবর্তন নিয়েও একটি বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও ইনভেস্ট বাংলাদেশের সিনিয়র কর্মকর্তারা—যা সরকারের বিদেশী বিনিয়োগ প্রণোদনা নীতি প্রণয়নে চেম্বারের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রতিফলন।

এ তৎপরতা দাঁড়িয়ে আছে এরই মধ্যে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর। বর্তমানে একশরও বেশি কোরীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রামের কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড), যা গড়ে তুলেছে ও পরিচালনা করছে ইয়াংওয়ান করপোরেশন। শুধু ইয়াংওয়ানেই কর্মরত আছেন প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিক, ৪০টিরও বেশি কারখানায়; পাশাপাশি স্যামসাং, হুন্দাই ও এলজিসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ মাত্রার কার্যক্রম দক্ষিণ কোরিয়াকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশী বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস, শিপ বিল্ডিং ও তথ্যপ্রযুক্তিতে ব্যাপকভিত্তিক সহযোগিতার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়—যদি বৃহৎ পরিসরে তা পুনরাবৃত্তি করা যায়।

এ শেষ বিষয়টিই এখন মূল নীতিগত চ্যালেঞ্জ। ইয়াংওয়ান ও কেইপিজেডের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে কোরীয় বিনিয়োগ প্রকৃত শিল্প বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তরিত হতে পারে, তবে একই সঙ্গে তা এটাও প্রকাশ করে যে জমি নামজারির বিলম্ব, গ্যাস সংযোগ জটিলতা ও প্রশাসনিক ঝামেলা কীভাবে একজন নিবেদিতপ্রাণ প্রধান বিনিয়োগকারীকেও ধীর করে দিতে পারে। সিইপিএর শুল্ক সুবিধা কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে মূল পরীক্ষা হলো—শুধু স্যামসাং ও ইয়াংওয়ানের মতো প্রতিষ্ঠিত নামের বাইরে গিয়ে মাঝারি সারির কোরীয় উৎপাদনকারীদেরও একই নীতিগত নিশ্চয়তা ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি দিতে পারে কিনা। এর জন্য প্রয়োজন দ্রুততর ইউটিলিটি সংযোগ, পূর্বাভাসযোগ্য কর প্রণোদনা, সহজতর শুল্ক ও ভিসা প্রক্রিয়া এবং ইলেকট্রনিকস, অটো যন্ত্রাংশ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের জন্য নির্দিষ্ট শিল্প অঞ্চল। এমন পদক্ষেপ ছাড়া সিইপিএর মাধ্যমে অর্জিত বাজার সুবিধা অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে; আর এসব বাস্তবায়িত হলে এ চুক্তি একটি সফল কোরীয় শিল্প অঞ্চলকে অনেক বিস্তৃত এক উৎপাদন অংশীদারত্বে রূপান্তরিত করতে পারে।

Source: প্রকাশ: বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বণিক বার্তা

Leave a Reply